দেশে বিদেশে: অর্বাচীনের জাপান যাত্রা, পর্ব ১

0
27

দু’ চার বছর পর পর দেশে যখন বেড়াতে যাই, নিজেকে তখন অতিথি মনে হয়। শীতের পাখির মতো যেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ক্ষণিকের জন্য উড়ে আসা। তাই তো দেশে গেলে সবাই বলে, কবে আবার চলে যাবি? মা ছাড়া কেউ বলে না- বিদেশে আর ফিরে না গেলে হয় না বাবা? এভাবেই আবেগ-অনুভূতিকে চাপা দিয়ে বিদেশের মাটিতেই প্রায় দুই যুগের কাছাকাছি সময় কেটে গেলো।

দীর্ঘ এ সময়টা একেবারেই কম নয়। বিশেষ করে একজন মানুষের পুরো জীবনের পরিধি বিবেচনায় নিলে এ সময়টা বেশ লম্বা বলতে হয়। সুদীর্ঘ এ সময়ে চষে বেড়িয়েছি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে। কখনোবা কানাডাতেও। যেমন বেড়িয়েছি হিরোশিমা ও নাগাসাকির পিস পার্কে, যেখানে ১৯৪৫ সালে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বোমা দুটির নাম ছিল – লিটল বয় ও ফ্যাটম্যান। পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া অনেক নৃশংস ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ঘটনা এ দুটি।

এ সাজানো গোছানো জাপানে আমার প্রথম আসার সুযোগ হয়েছিল ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে। সেটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা। কীভাবে আমি এসেছিলাম তখন জাপানে, প্রথম বিদেশ যাত্রার সেই অভিজ্ঞতাটুকু পাঠককে জানানোর লোভ এখানে সামলাতে পারছি না। তখন আমি সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে এমএসসি পাশ করেছি। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এক ফ্যাক্স বার্তায় জানতে পারলাম যে, আমার জাপান সরকারের ‘মনবসু স্কলারশিপ’ হয়েছে, পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য। স্কলারশিপ লেটারে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এক মাস, এর মধ্যেই জাপানে প্রবেশ করতে হবে, কিউসু বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জানুয়ারি মাস। কনকনে শীত তখন। ২২ জানুয়ারি ফ্লাইটের তারিখ। জাপান এয়ারলাইন্স। মনটা ফুরফুরা। কারণ প্লেনের ফ্রি-রাউন্ড টিকেট ও মনবসু স্কলারশিপ দুটোই জাপান সরকার থেকে পাওয়া। মাসিক স্টাইপেন্ডের পরিমাণ হচ্ছে এক লাখ পঁচাশি হাজার পাঁচশো ইয়েন। একশ ইয়েন মানে তখনকার চল্লিশ টাকা। অর্থাৎ মনবসু স্কলারশিপ মানে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জাপান সরকারের মনবসু স্কলারশিপ পাওয়ায় মনটা তখন সত্যিই হাওয়ায় হাওয়ায় ভাসছিল। স্বপ্নে ভরে উঠতে শুরু করেছিল মন। অনেক স্বপ্ন। বাড়ির বড় ছেলে হলে সংসারের দায়-দায়িত্বের কিছুটা নেওয়ার যে স্বপ্ন থাকে, ঠিক সে রকম।

জাপান যাবো অল্প সময়ের মধ্যেই। তাই মনের মাঝে এমন অনেক কল্পকাহিনী তখন রচিত হতে লাগলো। অবশ্য কল্পনায় যে সুখ মেলে তা আমি জানতাম। আমি সেই সুখের সাগরেই কেবল ভাসতে লাগলাম। এর মধ্যে জাপান যাবার সময় ঘনীভূত হয়ে এসেছে। ২২ জানুয়ারি খুব সন্নিকটে। আর মাত্র ৬-৭ দিন বাকি। টুকিটাকি কেনাকাটা তো করতে হবে। অথচ হাতে টাকাপয়সা নেই। কিন্তু সমস্যাও নেই, ধার নিলাম কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে। জাপানে গিয়ে ভবিষ্যতে দেনা পরিশোধ করে দেবো সে আশায়। কেউ দিলো পাঁচ হাজার টাকা, কেউ দশ হাজার। এভাবে আমার টাকার চাহিদাও আপাতত মিটে গেলো।

[X]

সেসময় নীলক্ষেত ছিল আমার প্রিয় জায়গার মধ্যে একটি। সেখানে স্বল্প দামে অ্যাকাডেমিক বইপুস্তক পাওয়া যায়। সব দেশি বা ভারতীয় প্রিন্ট। দাম কম। মরিসন অ্যান্ড বয়োড, আই এল ফাইনার, ভল অ্যান্ড টুলি, সায়েক্স পিয়ার, গ্লাস্তন- রসায়নের এই বেসিক বইগুলো জলের দামে সেখানে পাওয়া যায়। কিনে ফেললাম। নীলক্ষেতের মতো ঢাকায় আরেকটি পপুলার জায়গা আছে। যেখানে জলের দরে কাপড় পাওয়া যায়। বঙ্গবাজার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের পাশেই যার অবস্থান। দেহের পরিধেয় বস্ত্রসামগ্রি কিনে ব্যাগ ভর্তি হয়ে গেল। কেনাকাটার আরো কিছু বাকি আছে। জাপানিদের জন্য উপহার। নিউমার্কেট ও আড়ং থেকে উপহারও কেনা হয়ে গেল। ব্যাগভর্তি এ উপহারগুলো হলো আমার জাপান যাত্রার সঙ্গী।

নিউমার্কেট থেকে একটি বড় সাইজের লাগেজ কিনেছি। তাতে সব জিনিসপত্র ঢুকিয়েছি। ওজন হয়েছে ৪৭ কেজি। বাংলাদেশ থেকে জাপানগামী প্লেনগুলোতে তখন একটিমাত্র লাগেজ নেওয়া যেত, তাও হতে হবে ২২-২৩ কেজি। অতিরিক্ত ওজন হয়েছে ২৪ কেজি। ওজন নিয়ে তাই বিমানবন্দর লাগেজ চেকিং কাউন্টারে ছোটখাটো একটা ঝামেলা হয়ে গেল। তবুও ঘুষ ছাড়া যে ব্যাগ পার পেয়ে যাবে তা ভাবতে পারিনি। ব্যাগ চলে গেলো বেল্টের পথ বয়ে বয়ে ঠিক ঠিক প্লেনের পথে, অথচ আমি নিজেই আটকে গেলাম ইমিগ্রেশনের চেকিং-এ। এক মহাঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম।

ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন ‘এনওসি’ লাগবে। ‘এনওসি’ মানে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট। এনওসি কাগজটির ব্যাপারে আমার কোনো পূর্ব ধারণা ছিল না। বিদেশে যাবো অথচ এনওসি লাগবে, তাও আমার জানা ছিল না। তাছাড়া কে দেবে আমাকে সেই এনওসি? আমি দেশে কোথাও কোনো সরকারি বা বেসরকারি চুক্তিবদ্ধ চাকরি করিনি বা করার সুযোগই হয়নি। কারণ, পাশ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বাইরে পড়তে যাচ্ছি। সুতরাং আমাকে কেনইবা এনওসি নিতে হবে? আর কে তা দেবে? ইমিগ্রেশন অফিসারের সঙ্গে এসব তর্ক চলছিল।

এক পর্যায়ে আমার কাছে কতো ডলার আছে, সে প্রশ্নও উঠে আসলো। ঝামেলা আরো একটু বেড়েই গেলো বলতে হবে। কারণ, তারা কৌশলে আমার কাছে ডলার আছে কিনা তা জানতে চায়। ডলার যে আছে তা অস্বীকারও করিনি। আছে মাত্র তিনশো ডলার। তাও পাসপোর্টের সঙ্গে এন্ডোরস করা। এর মধ্যে প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে আসছে। অ্যায়ার কন্ডিশনের মাঝেও আমার শরীর ঘেমে যাচ্ছে। ভাবলাম, আমার জাপান যাওয়া বুঝি থেমে যাচ্ছে। মানসিক এক অস্থির সময় অতিবাহিত হচ্ছিলো। সিনেমার মতো থ্রিলিং, সেন্টিমেন্টাল। এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যেন ‘এনওসি’ না থাকায় আমি এক অপরাধী।

অবশেষে প্লেনের টাইম যখন সত্যিই ঘনীভূত হয়ে আসলো, আমার পকেট থেকে ঘুষ হিসেবে কোনো ডলার বের হলো না, তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তারা আমাকে প্লেনে যাবার অনুমতি না দিয়েও আর পারলেন না। বলতে পারেন যে, আমার মতো এমন কঠিন চিজ তারা হয়তো আগে কখনো আর দেখেননি। আমিও আমার জীবনে এমন দুঃসহ পরিস্থিতির মোকাবেলা আগে করিনি। পরিশেষে, অসীম সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই যে, বিনা ঘুষে বিমানবন্দরের রণতরী পার হয়ে গেলাম।

প্লেনের সিটে বসে স্বস্তির এক নিঃশ্বাস নিতে থাকলাম। দারুণ স্বস্তি, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। ভাবছি, কি ধকলটাই না পাড়ি দিয়ে এলাম!

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY