বরফ যুগের শক্তিশালী ‘সাদা বাঘ’ এখন বাংলাদেশে

0
30

‘সাদা বাঘ’ বাংলার বাঘের আরেক বৈশিষ্ট্য, যেটির শরীরের বর্ণ সাদা। এমন বাঘ এখন দেখা না গেলেও সম্প্রতি চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নিয়েছে তেমনই ডোরাকাটা সাদা বাঘ। বেঙ্গল টাইগার দম্পতি রাজ-পরীর ঘরে দেড় মাস আগে এই শাবকটির জন্ম। সাদা বাঘটির চোখ, নাক, লেজ সবকিছু সাদা রঙের। একই সময় মোট তিনটি শাবক প্রসব করে বাঘিনী। এর মধ্যে একটি বাচ্চা জন্মের পরদিনই মারা যায়। বাকি দুটি শাবক বেঁচে আছে। মারা যাওয়া অপর শাবকটিও সাদা রঙের ছিল।

white tiger born in bangladesh 2018 01

এক সময় এই ধরণের বাঘ ভারতের আসাম, বিহার, সুন্দরবন অঞ্চলের মধ্য প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্যান্য রাজ্যে দেখা যেত। এই বাঘের মধ্যেও বাংলার বাঘের মত ডোরাকাটা কালো দাগ, তবে দু’একটি সাদা বাঘ কাছাকাছি এমন রঙ বহন করে। বাঘ গবেষকরা মনে করেন, বরফ যুগে সাদা বাঘের অস্তিত্ব ছিল। যা পরবর্তীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করা কিছু বাঘ প্রজননের সময় সাদা বাঘের জন্ম দিয়ে থাকে।

এ বিষয়ে বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে এই ধরণের বাঘের জন্ম হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে বরফ যুগের সময় বাঘের পূ্র্ব-পূরুষরা সাদা ছিল। যে কারণে তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।

white tiger born in bangladesh 2018 02

তিনি জানান, সুন্দরবনে এমন বাঘের কোন অস্তিত্ব আছে বলে জানা নেই দেশের বাঘ গবেষকদের। তবে ভারতে যে ক’টি সাদা বাঘ জন্ম নিয়েছে তা প্রজননের মাধ্যমে করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার সাদা বাঘ ঘটনাক্রমে জন্ম নিয়েছে বলে মনে করেন এই প্রাণীবিদ।

সুন্দরবনে বাঘ নিয়ে গবেষণা করা ওয়াইল্ড টিমের প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলামও মনে করেন, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নেয়া সাদা বাঘ জিনগত বৈশিষ্টের মধ্যে হয়েছে। যা সচারচর জন্ম নেয় না। সুন্দরবনে এই ধরণের বাঘ থাকার সম্ভাবনা আছে। তবে বাঘ শুমারি চলাকালীন সময়ে তেমন কোন তথ্য বা নমুনা পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

এদিকে ভারতের মতো বাংলাদেশেও এই বাঘের বংশ বৃদ্ধি বা প্রজনন অব্যাহত রাখতে গবেষণা ও উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন প্রাণীবিদ ও বাঘ গবেষকরা।

[X]

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৩৩ লাখ টাকা দিয়ে বেঙ্গল টাইগার প্রজাতির দুটি বাঘ কিনে আনা হয় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানায় আনার দেড় বছর পর গত ১৯ জুলাই বাঘশাবকের জন্ম দেয় বাঘিনী। দর্শণাথীদের জন্য এখনো উন্মুক্ত করা হয়নি বাঘশাবকগুলোকে।

‘সাদা বাঘ’ নিয়ে কিছু তথ্য

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, এই জাতের বাঘের বৈজ্ঞানিক নাম Panthera tigris tigris। এদের শরীরের সাদা লোমের কারণ ফিওমেলানিনের অনুপস্থিতি। যা থাকলে বাঘের লোম সাধারণত কমলা বা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। অন্যান্য রয়েল বেঙ্গল বাঘের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, সাদা বাঘ তুলনামূলকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তাদের ওজনও হয় বেশি। জন্মের সময়ও তারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বড় থাকে। ২-৩ বছর বয়সে সাদা বাঘ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। সাদা পুরুষ বাঘ সাধারণত ওজনে ২০০ থেকে ২৬০ কেজি এবং দৈর্ঘ্যে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। জেব্রার মত সাধা বাঘেরও সাদা-কালো দাগগুলো আঙুলের ছাপের মত অনন্য হয়ে থাকে; একটি বাঘের নকশার সাথে অন্য কোন বাঘের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

white tiger born in bangladesh 2018

প্রকৃতিগতভাবে দশ হাজারে একটি বাঘ জন্মের ক্ষেত্রে সাদা রঙের হয়ে থাকে। বর্তমানে বিশ্বে কয়েক শত সাদা বাঘের অস্তিত্বের খবর জানা গেছে, যার মধ্যে প্রায় একশটি রয়েছে ভারতে। তবে সাদা বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় ৩৪টি সাদা বাঘ রয়েছে। এখানে জন্ম হওয়া বেশ কয়েকটি সাদা বাঘ ভারতের অন্যান্য চিড়িয়াখানা এবং বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।

সাদা রঙের লোমের কারণে এ ধরণের বাঘ বেশ জনপ্রিয়। সাদা রঙের সাইবারিয়ান বাঘের অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, যদিও বিভিন্ন সময় সাইবেরিয়া অঞ্চলে সাদা বাঘ দেখার খবর পাওয়া গেছে। অধিকাংশ সাদা বাঘই এরকম, শরীরে ডোরাকাটা দাগ থাকে। এরা এলবিনো নয়। এক বিশেষ জিন মিউটেশনের কারনে বাঘের লোম সাদা হয়। কিন্তু চামড়াতে ডোরাকাটা দাগ থেকেই যায়। আবার কিছু সাদা বাঘ ডোরাহীন হয়। এদের Snow white Tiger ও বলা হয়। ধারনা করা হয়, এই বাঘগুলো এলবিনো, আর এদের চামড়াই সাদা, তাই এদের ডোরাকাটা দাগ থাকে না।

তবে মজার কথা হলো বাঘের ডোরাকাটা দাগ এদের চামড়ার মধ্যেই থাকে। তাই একটা সুস্থ বাঘের সব লোম চেছে ফেললেও এর ডোরাকাটা দাগ থেকেই যায়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY