
সংরক্ষিত বনায়ন এখন অরক্ষিত হয়ে গেছে। গলাচিপার সংরক্ষিত ম্যানগ্রুভ ফরেস্ট খালে বাঁধ দিয়ে চলছে অবৈধ মাছ শিকার। বনবিভাগ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে চলছে অবৈধ মাছ শিকার। এতেকরে হুমকির মুখে পড়েছে ম্যানগ্রোভের ফরেস্ট এবং জীববৈচিত্র। প্রতিবছর অবৈধ মাছ শিকারীরা বনবিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজস রয়েছে বলে দাবী করেছেন গলাচিপা উপজেলার চরকারফারমার মাছ শিকারী জসিমের স্ত্রী রেশমা বেগম। সংরক্ষিত বনায়নের মধ্যে প্রবাহিত খালগুলোতে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। তবে মাছ শিকারের কথা স্বীকার করলেও এখন পর্যন্ত কোন খালে মাছ শিকারের বৈধ অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা নয়ন মিস্ত্রী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গলাচিপা উপজেলায় বনবিভাগের উদ্যোগে ১৫ হাজার ২৯০ একর ম্যানগ্রোভ বনায়নকে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনায়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনায়নে মাছ শিকারের জন্য গড়ে উঠেছে একটি চক্র। এরা বন বিভাগেরে কিছু অসাধু কর্তকর্তা ও কর্মচারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে বনের মধ্যের খালে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে দেদারছে মাছ শিকার করছে। আর এ মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এদের প্রশ্রয়ে সংরক্ষিত বনায়ন আজ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
গলাচিপা উপজেলার চরকারফারমার মাছ শিকারী বাক প্রতিবন্ধী জসিমের স্ত্রী রেশমা বেগম বলেন, গত দুই সপ্তাহ আগে চরকারফারমার সংরক্ষিত বনায়নে খালে বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার নিয়ে বাক প্রতিবন্ধী জসিমের উপর ওই এলাকার জাফর এবং মাহাবুব হামলা করে। এসময় জাফর বলে-খাল আমরা চার লাখ টাকা বিট রাখছি, তোরা মাছ ধরতে পারবি না। তিনি আরো বলেন, আমরা চাই এ খালগুলো খোলা থাকলে আমাদের মতো গরীবরা জাল দিয়ে মাছ ধরে জীবন চালাতে পারে।
এ বিষয়ে চরকারফারমার সংরক্ষিত বনায়নে অবৈধ মাছ শিকারী মাহাবুব বলেন, জসিমের সাথে আমাদের একটু ঝামেলা হইছিল। আমরা ফরেস্ট অফিস আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে চরকারফারমার বনের মধ্যে দক্ষিণের মোট আটটি খাল বিট নিয়েছি। এছাড়াও আরো যেসব খাল আছে সেগুলো অন্যেরা বিট নিয়েছে। আমরা যে খাল বিট নিয়েছি ওই খালে জসিম মাছ ধরার চেষ্টা করে। বাধা দিলে ওর সাথে আমাদের ঝামেলা হয় যা পরে মিমাংসা হয়েছে।
সংরক্ষিত বনায়নের চরকারফার মধ্যস্বত্ত্বভোগী মোশারেফ প্যাদা বলেন, প্রতিবছরই এ বন বিট দেওয়া হয়। এ বছরও একইভাবে ফরেস্ট অফিস আর রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করেই খালের বিট নেওয়া হয়েছে। যারা খালের বিট নেয় তারাই মাছ ধরে। আবার কেউ কেউ বিট বিক্রি করেও দেয়। তবে কোন অফিস বা রাজনৈতিক নেতাদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা পরে বলবেন বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে বনবিভাগের গলাচিপা রেঞ্জ কর্মকর্তা নয়ন মিস্ত্রী বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত কোন বনায়নের খাল বিট দেইনি। যারা খালে বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সংরক্ষিত বনের ভেতরে প্রবেশ করা মানেই বন ও বনের প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। বিভিন্ন সময় সরেজমিনে কথা বলে আমরা দেখেছি, তারা এই খালগুলোতে শুধু মাছ ধরে না, বিষও প্রয়োগ করে। এতে শুধু মাছ নয়, খালের ছোট-বড় সব জলজ প্রাণী ও প্রকৃতির ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠিক যেমনটা আমরা সুন্দরবনের ভেতরেও দেখতে পাই। এসব বন্ধে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’
মন্তব্য করুন