সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল : এক যুগের ত্যাগে তিন সন্তানের স্বপ্নপূরণ, গর্বিত মা আজও হাজার মাইল দূরে

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল : এক যুগের ত্যাগে তিন সন্তানের স্বপ্নপূরণ, গর্বিত মা আজও হাজার মাইল দূরে
filter: 0; jpegRotation: 180; fileterIntensity: 0.000000; filterMask: 0; module:31facing:1; hw-remosaic: 0; touch: (-1.0, -1.0); modeInfo: Beauty ; sceneMode: Hdr; cct_value: 0; AI_Scene: (-1, -1); aec_lux: 126.0; hist255: 0.0; hist252~255: 0.0; hist0~15: 0.0;

সন্তানের সাফল্যের খবর শুনে একজন মা কতটা আনন্দিত হতে পারেন, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্তে যদি সন্তানকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগও না থাকে, তাহলে সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে যায় এক গভীর কষ্ট।
এমনই এক মা তিনি। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছেন প্রবাসে। ছোট ছোট তিন সন্তানকে রেখে ২০১৪ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন হংকংয়ে। এরপর ২০১৯ সালেও জীবিকার প্রয়োজনে আবার বিদেশে যেতে হয় তাকে। প্রায় এক যুগ ধরে প্রবাসের মাটিতে সংগ্রাম করে চলেছেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই, সন্তানরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।
আজ সেই তিন সন্তানই মায়ের দীর্ঘ ত্যাগের প্রতিদান দিচ্ছে নিজেদের সাফল্যের মধ্য দিয়ে। একজন সন্তান পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি পেয়েছে জিপিএ-৫। অন্য দুই সন্তানও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলছে। দূর প্রবাসে বসে সন্তানদের সাফল্যের খবর শুনে আনন্দে চোখ ভিজে যায় মায়ের। কিন্তু সেই চোখের জলে আনন্দের পাশাপাশি আছে দীর্ঘদিনের না-পাওয়ার বেদনা।
স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর শুরু যুদ্ধ :
স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর মাত্র দুই বছর বয়সী এক সন্তানসহ তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন এই নারী। সন্তানদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিনই বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা।
একদিকে সংসারের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে তিনটি নিষ্পাপ মুখ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, সেই চিন্তা থেকেই জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০১৪ সালে হংকংয়ে পাড়ি জমান। মায়ের জন্য সেটি ছিল শুধু বিদেশযাত্রা নয়, ছিল নিজের সন্তানদের জন্য নিজের জীবনকে নতুন করে উৎসর্গ করার শুরু।
প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। একাকীত্ব সহ্য করেছেন। উৎসব-পার্বণে সন্তানদের কাছে থাকতে পারেননি। অসুস্থতা কিংবা আনন্দের মুহূর্তেও সন্তানের মাথায় হাত রেখে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়নি। তবু থামেননি। কারণ তার চোখের সামনে ছিল তিনটি সন্তান এবং তাদের ভবিষ্যৎ।
মায়ের অনুপস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সন্তানদের জীবন :

পারিবারিক জীবনের নানা পরিবর্তনের মধ্যে সন্তানদের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে বলে জানান ওই মা। ফলে মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সন্তানদের নিরাপত্তা, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
একপর্যায়ে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হন তিনি। মায়ের আকুতি ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তীতে তিন সন্তানের সরকারি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়। সেখান থেকেই যেন বদলে যেতে থাকে তাদের জীবন।

মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকলেও তারা পায় নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ। আর দূর দেশে থাকা মা প্রতিটি দিন কাটাতে থাকেন সন্তানদের সাফল্যের অপেক্ষায়।

সাফল্যের খবর আসে, কিন্তু মা থাকেন দূর দেশে- অবশেষে সেই অপেক্ষার দিন এসেছে :

তিন সন্তানের মধ্যে একজন পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সন্তানের এই অসাধারণ সাফল্যের খবর যখন মায়ের কানে পৌঁছায়, তখন প্রবাসের মাটিতে বসেই আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

এ যেন তার বছরের পর বছর কষ্টের প্রথম বড় পুরস্কার:

কিন্তু সেই পুরস্কার হাতে নেওয়ার মতো করে সন্তানকে কাছে পাননি তিনি। সন্তানের ফলাফল হাতে নেওয়ার মুহূর্তে পাশে দাঁড়াতে পারেননি। সাফল্যের পর সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলতে পারেননি, “তুই পেরেছিস, মা।”

এই না-পারাটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ-মায়ের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলছে অন্য দুই সন্তানও :

শুধু একজন নয়, প্রবাসী মায়ের অন্য দুই সন্তানও নিজেদের পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দিয়ে চলেছে।

তাদের একজন পড়াশোনা করছে বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশনে। অন্যজন পড়ছে পটুয়াখালী কারিগরি স্কুলে। শিক্ষকদের কাছেও তারা ভালো ও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত।

তিন সন্তানই এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ভবিষ্যতের দিকে। আর তাদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের ত্যাগ, অশ্রু, অপেক্ষা ও প্রার্থনা।

“সন্তানদের মুখে হাসি দেখার জন্যই সব কষ্ট সহ্য করেছি”

প্রবাসী মা বলেন,“আমি হয়তো সন্তানদের পাশে থেকে তাদের বড় করতে পারিনি। তাদের ছোটবেলার অনেক মুহূর্ত আমি হারিয়েছি। তাদের আনন্দের দিনে কাছে থাকতে পারিনি। কিন্তু তাদের মুখে হাসি দেখার জন্যই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো পার করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমার সন্তানরা যেন ভালো মানুষ হয়, লেখাপড়া করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ায়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তারা যদি জীবনে ভালো কিছু করতে পারে, তাহলে আমার এত বছরের কষ্ট সার্থক হবে।”

এক মায়ের কাছে সন্তানরাই তার পৃথিবী :

প্রবাসে থাকা এই মায়ের গল্প শুধু একজন নারীর গল্প নয়। এটি সেইসব মায়ের গল্প, যারা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের বর্তমানকে বিসর্জন দেন।

যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের ক্ষুধা ভুলে যান, যে মা সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন, যে মা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হাজার মাইল দূরে একাকী জীবন কাটান, তার ত্যাগের মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে মাপা যায় না।

আজ তার তিন সন্তান এগিয়ে যাচ্ছে। একজনের সাফল্য ইতোমধ্যে তাকে গর্বিত করেছে। অন্য দুজনও এগিয়ে চলছে একই স্বপ্নের পথে।

শুধু একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে- সন্তানের সাফল্যের দিনে মা পাশে নেই :

হয়তো কোনো একদিন প্রবাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই মা সন্তানদের সামনে দাঁড়াবেন। হয়তো তখন কোনো কথা বলবেন না। শুধু তিন সন্তানকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদবেন।

সেই কান্নায় থাকবে এক যুগের বিচ্ছেদ, অসংখ্য রাতের একাকীত্ব, হাজারো না-পাওয়ার কষ্ট আর শেষ পর্যন্ত সন্তানদের সাফল্য দেখে পাওয়া এক মায়ের সীমাহীন আনন্দ।

সন্তানদের জন্য এই মায়ের একটাই প্রার্থনা—তারা যেন সুশিক্ষিত, সৎ ও ভালো মানুষ হয়ে নিজেদের জীবন গড়ে তোলে এবং একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করে।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল : এক যুগের ত্যাগে তিন সন্তানের স্বপ্নপূরণ, গর্বিত মা আজও হাজার মাইল দূরে

গলাচিপা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসিতে সাফল্য : উপজেলায় মেধাক্রমে প্রথম ও তৃতীয়

গলাচিপায় বিএনপি নেতার মৃত্যুতে তদন্ত কমিটি গঠন

গলাচিপায় সাপের কামড়ে বিএনপি নেতার মৃত্যু

গলাচিপায় জুলাই গণঅভুত্থান দিবস উদযাপন : আলোচনা সভা, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা

গলাচিপায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপিত

গলাচিপায় স্কুল ফিডিং খাদ্যে অনিয়মের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক বরখাস্ত

গলাচিপার সংরক্ষিত বনায়ন এখন অরক্ষিত : হুমকির মুখে ম্যানগ্রোভের ফরেস্ট এবং জীববৈচিত্র

ফিটনেস বিহীন গাড়ি ও অনভিজ্ঞ চালক : মামলা করার আহ্বান জানালেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গলাচিপায় জামায়াতের গণমিছিল

১০

গলাচিপায় অনলাইন জুয়ার নেতিবাচক প্রভাব ও প্রতিরোধের উপায় করণীয় শীর্ষক সেমিনার

১১

গলাচিপায় স্কুলের মাঠ কেটে ঘেরের পানি নিষ্কাশন: শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে দুর্ভোগ

১২

গলাচিপা প্রেসক্লাব : প্রয়াত সম্পাদক রিচার্ডের স্মরণ সভা

১৩

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন : টানা দুইবার বিভাগের সেরা ইউএনও গলাচিপার ইজাজুল হক

১৪

গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : ডেন্টাল সার্জন থাকলেও মিলছে না কাঙ্খিত সেবা

১৫

গলাচিপায় খালে পড়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবকের মৃত্যু

১৬

বাম হাতে ছাতা ডান হাতে কলম নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা

১৭

বৈরী আবহাওয়ায় গভীর সাগরে তিন ট্রলার ডুবি, নিখোঁজ ১৩ জেলে

১৮

বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ আল আমিন জীবিত উদ্ধার : ‘অপর ৫ জেলে হয়তো বেঁচে আছেন’ -আল আমিন

১৯

বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ জেলে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা

২০